দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে অনলাইন ব্যাংকিং। সাধারণ ব্যাংকিংয়ের চেয়ে দ্রুতগতির এবং সুবিধাজনক অনলাইন ব্যাংকিং। তবে এ ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকি তুলনামূলক ভাবে বেশি। যদি কিছু বিষয় জানা থাকে এই ঝুঁকিগুলি খুব সহজেই এড়াতে পারবেন আপনি। এখানে আপনার জন্যে অনলাইন ব্যাংকিং নিরাপত্তা বিষয়ে ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ থাকছে:

১. পাবলিক ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করবেন না

অনিরাপদ বা পাবলিক ওয়াইফাই ইন্টারনেট কানেকশন ব্যবহার করে কখনোই আপনার ব্যাংকিং ইনফরমেশন প্রদান করবেন না। পাবলিক ওয়াইফাই কানেকশনগুলি সাধারণত এনক্রিপ্টেড থাকে না, যার কারণে হ্যাকারদের জন্যে তথ্য চুরি খুব সহজ হয়। ফলে, শুধুগ যখন বাড়িতে থাকবেন বা প্রাইভেট ইন্টারনেট কানেকশন ব্যবহার করবেন তখনই অনলাইন ব্যাংকিং কার্যক্রম সারুন। ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহারের কারণে অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম থাকবে।

২. টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করুন

নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে টু ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। যেকোনো ব্যাংকিং ইনফরমেশন ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বা অ্যাকাউন্টে প্রবেশের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাটি চালু করতে পারেন। টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন অ্যাড করলে যেই সুবিধাটা পাবেন, কখনো যদি কেউ আপনার অ্যাকাউন্টে ঢোকার চেষ্টা করে বা ঢুকে লেনদেনের চেষ্টা করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে একটা এসএমএস বা ইমেইল অ্যালার্টের মাধ্যমে আপনি খবর পেয়ে যাবেন। অ্যালার্টে একটি ইউনিক কোড থাকবে। তখন শুধু সেই কোড ব্যবহার করেই আপনার অ্যাকাউন্টে প্রবেশ বা লেনদেন করা যাবে। নাহলে না।

৩. অ্যাকাউন্টে লগইন করার জন্য কখনোই কোনো ইমেইল লিংকে ক্লিক করবেন না

ব্যাংক মাঝে মাঝেই আপনাকে বিভিন্ন তথ্য বা সেবা’র কথা জানিয়ে ইমেইল করে। তা সমস্যার না, তবে ইমেইলগুলিতে দেখবেন লিংক থাকতে পারে অনেক সময়। সেই লিংকগুলিতে ক্লিক করে কখনোই আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করার চেষ্টা করবেন না। বরং সরাসরি ব্যাংকের ওয়েবসাইটে গিয়ে সেখান থেকে লগইন করুন। কিন্তু কোনোভাবেই কোনো ইমেইলে থাকা লিংক ব্যবহার করবেন না। কারণ ইমেইলের মাধ্যমে যে কেউ আপনাকে অন্য কোনো লিংক দিয়ে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ইউজার নেইম আর পাসওয়ার্ড চুরি করে নিতে পারে।

৪. যত কম সহজ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা যায় তত ভালো

অনলাইনের সকল কাজের জন্য আপনি একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করছেন কি?। কিন্তু ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে আপনার উচিৎ একেবারেই আলাদা, ভিন্ন একটা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা। সেটার জন্য বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা, প্রতীক ইত্যাদি বিভিন্ন কি ব্যবহার করে একটু জটিল পাসওয়ার্ড তৈরি করুন। এবং কিছুদিন পর পর নিয়মিত পাসওয়ার্ড বদলে ফেলুন।

৫. নিয়মিত অ্যাকাউন্টের খোঁজ খবর রাখুন

সপ্তাহে একবার ভালো করে আপনার অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করুন। প্রতিটা লেনদেনের তথ্য দেখুন এবং নিশ্চিত হতে চেষ্টা করুন সেগুলি সব আপনারই করা কিনা। সন্দেহজনক কিছু দেখলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সে কথা অবহিত করুন।

আর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে যদি অনলাইন থেকে কিছু কিনেন, তাহলে প্রতিবার কেনার আগে সবকিছু ডাবল চেক করে নিন।

৬. ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করুন

এই তথ্যটি আপনি জানেন কিনা, ব্যাংক তাদের মোবাইল অ্যাপ সবসময় এনক্রিপ্টেড রাখে? ব্যাংকের ওয়েবসাইটের চেয়ে মোবাইল অ্যাপে হ্যাকারদের অ্যাটাক কম হয়। সুতরাং এটা তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ। ব্যাংকের সেই নির্দিষ্ট মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করতে চেষ্টা করুন। খেয়াল রাখুন অ্যাপটিতে কোনো নতুন আপডেট এসেছে কিনা, এলে তা ডাউনলোড করুন। নতুন আপডেটে সিকিউরিটি সার্টিফিকেটগুলি সবসময় হালনাগাদ করা থাকে।

৭. ডিভাইস লক করে রাখুন

ব্যাংকের তরফ থেকে ব্যাংকিং ইনফরমেশন বা তথ্যের ক্ষেত্রে যদিও সবসময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়, তবু আপনার ডিভাইসটি সবসময় লক করে রাখুন। ফোন, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, ট্যাব ইত্যাদি যেসব ডিভাইস থেকে আপনি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লগইন করেন সেগুলি লক করে রাখুন। লক করার জন্যে পাসওয়ার্ড, পিন ব্যবহার করুন। যেসব ক্ষেত্রে সম্ভব সেসব ক্ষেত্রে ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করুন। নিরাপত্তা যত কঠিন করে তুলতে পারবেন, আপনার অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি যাওয়ার সম্ভাবনা ততই কম হবে।

৮. যখন ব্লুটুথ (Bluetooth) দরকার নেই তখন অফ রাখুন

সাইবার হ্যাকারদের নতুন একটি পদ্ধতি হল ডিভাইসের ব্লুটুথের মাধ্যমে তথ্য চুরি করা। ব্লুটুথ কানেকশন ব্যবহার করে আপনার ডিভাইস হ্যাক করে এমনকি কিছু নির্দিষ্ট ফাংশনের কন্ট্রোলও নিয়ে নিতে পারবে তারা। সুতরাং যখন ব্যবহার করছেন না, তখন ব্লুটুথ বন্ধ করে রাখুন।

৯. অটোমেটিক লগইন বন্ধ করে রাখুন

আপনার ডিভাইসটি নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া আর কেউই ব্যবহার করে না। তারপরও অনলাইন ব্যাংকিং এর ক্ষেত্রে অটোমেটিক লগইন বা পাসওয়ার্ড রিমেমবার অপশন ডিজেবল করে দিন।কারণ এই বিষয়ে কখনোই নিশ্চিত হতে পারবেন না ভবিষ্যতে আপনার ডিভাইসটি অন্য কারোর হাতে পড়বে কিনা বা পড়লেও সে সৎ উদ্দেশ্যেই তা ব্যবহার করবে কিনা।

আরেকটি কাজও করতে পারেন এর সঙ্গে, অনলাইন ব্যাংকিং সংক্রান্ত সব সংরক্ষিত বা সেভ করা তথ্য ডিলিট করে দিন।

১০. ইন্টারনেট কানেকশন নিরাপদ কিনা সবসময় চেক করুন

ইন্টারনেটে যেকোনো সেনসিটিভ তথ্য ব্যবহার করার আগে কানেকশন নিরাপদ কিনা চেক করে নিন। যদি কানেকশন নিরাপদ হয় তাহলে ব্রাউজারের অ্যাড্রেস বারে সবুজ চিহ্ন দেখা যাবেঅথবা ‘http’ এর বদলে ‘https’ লেখা থাকবে। এর অর্থ হল আপনি এনক্রিপ্টেড বা নিরাপদ কানেকশন ব্যবহার করছেন। এর কোনোটাই যদি না হয়, তাহলে আপনি বিপদে আছেন।

১১. ডিভাইসগুলি সবসময় আপ-টু-ডেট রাখুন

নিয়মিত আপডেট ডাউনলোড করা হয়ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে ডিভাইস আপডেট করার আরেকটা অর্থ হচ্ছে আপনি একবারে নতুন সিকিউরিটি ফিচারগুলিও পাচ্ছেন ডাউনলোড থেকে।কয়েক সপ্তাহ দেরি করে আপডেট ডাউনলোড করার বদলে সবসময় সাথে সাথেই করে ফেলুন। এতে আপনার ডিভাইসের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

১২. লগ আউট করতে কখনোই ভুলবেন না

অধিকাংশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপে অটোমেটিক লগ আউট ফিচার থাকে। আপনি লগ ইন করে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কোনো কাজ না করলে একসময় আপনাকে অটোমেটিক লগআউট করে দেওয়া হয়। তারপরও শুধু এই ফিচারের উপর ভরসা করা উচিত হবে না আপনার। অভ্যাস তৈরি করুন, প্রতিবার কাজ শেষ হলে নিজেই লগ আউট করে বের হয়ে আসবেন। এতেআপনার অ্যাকাউন্টের তথ্য অন্য কারো হাতে পড়ার ঝুঁকি কমবে।

১৩. অ্যান্টি ভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করুন

কম্পিউটারে সবসময় লাইসেন্স দেওয়া অ্যান্টি ভাইরাস সফটওয়্যার চালু রাখুন। এতে কম্পিউটারে বিপদজনক ম্যালওয়্যার বা স্পাইওয়্যার আক্রমণের ঝুঁকি কমে যাবে।

এবং অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারটি নিয়মিত আপডেট দিন। আপডেট দেওয়ার ক্ষেত্রে ম্যানুয়ালি আপডেট দিতে চেষ্টা করুন। এতে আপনিও নিশ্চিত হতে পারবেন আপনার সফটওয়্যারঅথোরাইজড বা বৈধ আপডেটগুলি পাচ্ছে কিনা।
.

অনলাইন ব্যাংকিং ও ব্যক্তিগত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই উপরের ১৩টি পরামর্শ।দৈনন্দিন জীবনের রুটিন কাজের মতই এই পরামর্শগুলি অনুসরণ করতে চেষ্টা করুন। এবং তা আপনার অনলাইন ব্যাংকিং কার্যক্রমে প্রয়োগ করে দেখুন। তাতে আশা করা যায়, আপনার রক্ষিত অর্থ আগের থেকে নিরাপদে থাকবে।

#ব্যাংকিং #অনলাইন_ব্যাংকিং

admin

I am the author and founder of this blog.

Leave a Reply